রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন (How heart patients can stay healthy during Ramadan)
সাধারণত রমজান মাসে মানুষের দৈনন্দিন কার্যকলাপের বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে থাকে। আর এই সময়ে হার্টের রোগীরা বেশ কিছু সমস্যায় পড়েন। তাই রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন তা জানতে আজকের আর্টিকেলটি পড়ুন।
আসলে রোজার সময় মানুষের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, ওষুধ গ্রহণের সময়সূচি, ঘুমের সময় এমনকি পরিমাণও পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে জন্যই হৃদরোগীদের সতর্ক থাকা অতীব জরুরী। ফলে রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন তা নিম্নে আলোচিত হল।
পোস্ট সূচিপত্র: রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন
একজন হৃদরোগীকে খেয়াল রাখতে হয় যে বিষয়গুলি :
একটা বিষয় খেয়াল করে দেখবেন, একজন সুস্থ স্বাভাবিক পূর্ণবয়স্ক মানুষ যেভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষ বা একজন হৃদরোগীর পক্ষে কখনোই তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
আরও পড়ুন: কাঁচা রসুনের উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম
তাই, রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন বলতে প্রায়ই দেখা যায়, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের অনেকের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা এমনকি কিডনির মতো বিষয়গুলি পাশাপাশি অবস্থান করে। ফলে রোজা করার সময় খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধপত্র নতুন করে সময়োপযোগী বা আপডেট করে নিতে হয়। সর্বোপরি এসব বিষয়ে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত দরকার।
যেসব হৃদরোগীর রোজা করা যাবেনা:
রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন বলতে সাধারণত যাদের হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা কম (LVEF ২৫ ভাগের নিচে) তাদের রোজা না রাখাই উত্তম। মূলত: যাদের হার্ট অতিরিক্ত দুর্বল, যেসব হৃদরোগীর অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস আছে, কিডনির জটিল সমস্যা আছে তাদের রোজা না রাখাই যুক্তিসংগত। তবে সর্বাগ্রে এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত।যে বিষয়গুলি মেনে চলতে হবে:
ইফতারের সময় অতিরিক্ত খাওয়া যাবে না:
সাধারণত দুটি প্রধান হরমোন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবিত করে- ১) ঘেরলিন: যা ক্ষুধাকে উদ্দীপিত করে ও ২) লেপটিন: যা ক্ষুধাকে দমন করে। অর্থাৎ যখন আপনি কিছুক্ষণ খান না, তখন ঘেরলিনের মাত্রা বাড়ে আবার খাওয়ার পরে লেপটিনের মাত্রা শরীরকে বলে যে এটি পূর্ণ। সুতরাং অত্যধিক খাওয়া শরীরের এই ভারসাম্যকে ব্যাহত করতে পারে, যা অত্যধিক খাওয়ার একটি চিরস্থায়ী চক্রকে ট্রিগার করে এবং ওজন বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তাই রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন হিসেবে প্রচুর পরিমাণে খাবার ইফতারি খাওয়া যাবে না।
ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে হবে:
রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন বলতে কফি, চা ও কোমল পানীয়ের মতো ক্যাফেইন গ্রহণ গ্রহণ করা যাবে বা করলেও তা সীমিত। কারণ এটি আয়রন শোষণকে বাধা দিতে পারে ও প্রস্রাবের প্রবাহকে বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা ডিহাইড্রেশনের অন্যতম কারণ হতে পারে। এ ছাড়াও ক্যাফেইন হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই পেটের ফোলাভাব এড়াতে চা ও কফির বদলে পুদিনা ও আদাযুক্ত পানীয় পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।খাবারের পরপরই পানি পান না করা:
ইফতারির সময় একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে পানীয় ও খাবার
খেলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এজন্য ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ছোট ছোট বা পরিমিত ভাবে খাবার ও পানীয় গ্রহণ করুন। রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন পানি পান করতে হবে তা ধীরে ধীরে।
অতিরিক্ত ভাজা পোড়া চিনিযুক্ত খাবার না খাওয়া:
রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন যেভাবে, কারণ অনেকেই ইফতারে ভাজা ও চিনিযুক্ত খাবার খান। এটি একজন মানুষের স্থূলতা ও ইনসুলিন প্রতিরোধকে উন্নীত করতে পারে, যা তা বিপাকীয় সিন্ড্রোমের জন্য দুটি প্রধান ঝুঁকির কারণ।আরও পড়ুন: জেনে নিন, কোন কোন ফলে বাড়ে লিভারের কার্যকারিতা
আপনার জেনে রাখা উচিত যে, এর থেকে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। তবে এসবের বদলে অবশ্যই খাদ্য তালিকায় ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য ও চর্বিহীন প্রোটিন জাতীয় খাবার রাখাটা খুবই জরুরী।
পর্যাপ্ত ঘুমের ব্যাঘাত:
রোজার সময় অনেকেরই কম ঘুমের ফলে রাগ, মাথাব্যথা ও ক্ষুধার কারণে মানসিক চাপ বেড়ে যেতে পারে। যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হার্টের কাজের চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।শারীরিকভাবে সুস্থ্য থাকা:
রমজানের সময় হৃদরোগীরা খুব বেশি পরিশ্রম না করে সাধারণত তারা ইফতারের ১-২ ঘণ্টা আগে হাঁটা, যোগ ব্যায়াম বা স্ট্রেচিংয়ের মতো হালকা থেকে মাঝারি ক্রিয়াকলাপ বেছে নেয়। এটি আসলেই ঠিক নয়। কারণ ভুল সময়ে শরীরচর্চা করলে হৃদপিণ্ডে বেশি চাপ পড়ে, যার ফলে অনেকে অজ্ঞান বা স্ট্রোক পর্যন্ত করতে পারেন।হৃদরোগীর জন্য করণীয়:
যেসব হৃদরোগীর হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা স্বাভাবিক তারা অন্য সবার মতো রোজা রাখতে পারবেন। হৃদরোগীদের বেশির ভাগ ওষুধ দিনে একবার বা দুবার খেলেই হয়। যেসব ওষুধ দিনে একবার খেলে চলে রোজার সময় সেগুলো রাতের খাবারের সময় নিলেই চলবে। যেসব ওষুধ দিনে দুইবার খেতে হবে সেগুলো ইফতার ও সাহরির সময় খেলে চলবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন দুই ডোজের মধ্যবর্তী সময়টি সংক্ষিপ্ত না হয়। বিশেষ করে রক্তচাপের ওষুধ পর্যাপ্ত ফারাক দিয়ে সেবন করতে হবে। অর্থাৎ নিয়ম মোতাবেক চলাই রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন।রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন-পরিশেষে:
রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন হিসেবে অবশ্যই রোজার সময় খাদ্য ও পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় রক্তচাপ কমে যেতে পারে। তাই সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে মাত্রা কমানো যেতে পারে। মনে রাখবেন, কিছু কিছু হৃদরোগের ওষুধ (যেমন Nitrate) সকালে ও বিকালে খেতে হয়, রোজার সময় সেগুলো সাহরি ও ইফতারের সময় সমন্বয় করতে পারেন। আবার কিছু ওষুধ দিনে তিনবার নিতে হয়, সেগুলো স্লো রিলিজ ফর্মে দিনে একবার বা দুবারে খেতে পারেন।আসলে রমজানে হৃদরোগীরা যেভাবে সুস্থ থাকবেন বলতে যে সমস্ত হৃদরোগীদের
ডায়াবেটিস আছে, তাদের বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। দিনের
দীর্ঘ সময় খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ না করায় রক্তে সুগারের পরিমাণ মারাত্মকভাবে
কমে যেতে পারে। এসবের ফলে হঠাৎ করেই জ্ঞান হারানো বা মাথা ঝিমঝিম কিংবা বুক ধড়ফড় করে
প্রচুর ঘাম বের হলে ধরে নিতে পারেন শরীরে সুগারের মাত্রা কমে গেছে, এক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ সুগার পরীক্ষা করতে হবে এবং সম্ভব হলে ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধের মাত্রা ঠিক করতে হবে। সাধারণত
রোজার সময় যেসব ওষুধ দ্রুত রক্তের সুগার কমায় তা অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।
অবশ্যই ইনসুলিনের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ইনসুলিনের মেজর অংশটি
ইফতারের সময় নিলে ভালো, আর স্বল্প মাত্রাটি সাহরির সময় নিতে হবে, যাতে
দিনের দীর্ঘ সময়ে সুগার কমে না যায়।
আরও পড়ুন: মুখের দুর্গন্ধে শরীরের কী ক্ষতি হয়?
বলাই বাহুল্য যে সমস্ত হৃদরোগীদের অ্যাজমা আছে তাদের মুখে ওষুধ গ্রহণে তেমন সমস্যা হয় না। অর্থাৎ সাহরি-ইফতারির সময় নিলেই হবে। কিন্তু যাদের ঘন ঘন ইনহেলার (যেমন Azmasol Inhaler বা Nebulizer) নিতে হয় তারা সেটি নিতে পারবেন। কারণ ইনহেলার ফুসফুসে বাতাসের সঙ্গে টেনে নিতে হয়। পেটে যাওয়ার দরকার পড়ে না। আর যেসব ইনহেলার (যেমন-Bexitrol Inhaler) দিনে দুবার নিয়মিত নিতে হয়, সেগুলো সাহরি ও ইফতারির সময় নিলেই চলবে। তাই এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url